সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু ৫-৬ নভেম্বর


কক্সবাজার : আজ ১ নভেম্বর থেকে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও প্রথম দিনে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করেনি।
প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় জাহাজ চলাচল কয়েকদিন পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ৫ অথবা ৬ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের নিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।
সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকেই সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম শুরুর কথা ছিল। তবে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়ায় জাহাজ চলাচল কয়েক দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী সপ্তাহের শুরুতে নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ অক্টোবরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
পর্যটন মৌসুম শুরুর অপেক্ষায় দ্বীপজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁয় সংস্কার, রং করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নতুন করে সাজানোর কাজ প্রায় শেষ। দীর্ঘদিন পর্যটকসংকটের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া ব্যবসায়ীরা নতুন মৌসুম ঘিরে আশাবাদী।
পর্যটক পরিবহনের জন্য সেন্টমার্টিন জেটি ও কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটেও প্রস্তুতি চলছে।
জাহাজমালিকদের সংগঠনের ভাষ্য, সেন্টমার্টিন জেটি পর্যটকবাহী জাহাজ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। তবে নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য প্রয়োজনীয় সিঁড়ির সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, সেন্টমার্টিন জেটির প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। তবে নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য আরও একটি সিঁড়ি স্থাপন করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনের পর বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশনা ও শর্ত মেনে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ - এই ৩টি জাহাজকে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া থেকে সেন্টমার্টিন নৌপথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্য জাহাজগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনও চলছে।
কক্সবাজার নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, “নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে শেষ হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া গেলে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।”
পর্যটকদের আগমন ঘিরে দ্বীপের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন পর্যটক চলাচলে সীমাবদ্ধতা ও রাতযাপনে বিধিনিষেধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নতুন মৌসুমে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা তাঁদের।
সেন্টমার্টিনের একটি রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, “দীর্ঘদিন ব্যবসা প্রায় বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন পর্যটক আসার খবর তাঁদের কাছে নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর আকাশ বলেন, “সেন্টমার্টিনের ব্যবসা মূলত দুই থেকে তিন মাসের পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। এই সময়ের আয়ের ওপরই সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে। ফলে কোনো কারণে পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হলে স্থানীয় মানুষের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ সংস্কারের জন্য ৩ শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই করে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে ২ শতাধিক আবাসিক হোটেল ও পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তবে প্রস্তুতির পাশাপাশি জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে পন্টুনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে ক্ষয় হয়েছে। পর্যটক চলাচল শুরুর আগে সংস্কার করা না হলে যাত্রী ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকের আলম জানান, জেটির মূল কাঠামো প্রস্তুত থাকলেও পন্টুনের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত এটি মেরামত করা প্রয়োজন।
সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি আব্দুর রহমান বলেন, “পর্যটকদের আসা শুরু হলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে আবার গতি ফিরবে। এতে পর্যটননির্ভর হাজারো মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “দ্বীপের অধিকাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংস্কারকাজ শেষ পর্যায়ে। তবে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে জেটির পন্টুন দ্রুত মেরামত করা দরকার।”
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, প্রায় ৭কোটি টাকা ব্যয়ে জেটির উন্নয়নকাজ চলছে। কিছু কাজ এখনও বাকি থাকলেও জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মসহ প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজ নিয়ে ওঠা অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, “পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবারের পর্যটন মৌসুম পরিচালনা করা হবে। হোটেল ও রিসোর্ট সংস্কারের আবেদন যাচাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।”
- জাফর আলম










